টেকসই উন্নয়নে মূল্যবোধ: মোসলেম উদ্দিন

 

টেকসই উন্নয়নে মূল্যবোধ

মোসলেম উদ্দিন


এই রাষ্ট্র দক্ষ অফিসার, চিকিৎসক, ইঞ্জিনিয়ার, সফল উদ্যোক্তা প্রভৃতি তৈরির উদ্যোগ নিলেও মানুষ তৈরির কৌশল বা পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি! আমরা যত উন্নত সভ্যতাই নির্মাণ করি না কেন তার মানুষ যদি মানুষের মত না হয় তাহলে একদিন সব ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। ভালো মানুষ চেনা ও জানার অনেকগুলো গুণাবলির মধ্যে লজ্জাশীলতা হলো প্রথম ও প্রধান গুণ। যার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মানুষ অপকর্ম, অনৈতিক কাজ থেকে দূরে থাকতে পারে! টেকসই উন্নয়নে মানুষের মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম।

প্রসঙ্গত, লজ্জাকে মানুষের পোশাকের সঙ্গে তুলনা করা যায়। পোশাক যেমন মানুষের দেহ তথা ইজ্জত ঢেকে রাখে তেমনি লজ্জাও খারাপ কাজকে সংযত রেখে সৎকর্মকে উপস্থাপনের মাধ্যমে মানুষকে মহান করে তোলে। অপরপক্ষে মানুষের আচরণগত প্রকাশিত চরিত্র হলো জন্মের পর পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র দ্বারা যা শিখে তার ফলাফল। ভালো মানুষই কেবল একটি রাষ্ট্রের টেকসই জনসম্পদ। সে জন্য আগে ভালো মানুষ তৈরি করতে হবে এবং তার জন্য মানুষের মধ্যে লজ্জাবোধের জন্ম দিতে হবে। জন্মের পর থেকে পরিবেশীয় প্রভাবিত এসব উপাদান দ্বারা লজ্জাবোধের বিকাশ হলেই মানুষের মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটবে। আর মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটলেই সব অনৈতিক কর্ম থেকে মানুষ সরে আসতে পারে এবং মানবিকতার পতাকাতলে শান্তির বাতাস ছড়িয়ে পড়তে পারে।

একটু লক্ষ করলেই আমরা দেখতে পাই, আমাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে আনুপাতিক হারে পুলিশ, প্রশাসনের লোকবলও বাড়ছে, বাড়ছে ডিজিটাল জবাবদিহিতা। শিক্ষার হার, উৎপাদন ও কর্মমুখী শিক্ষাও আগের চেয়ে বহুগুণ বাড়ছে; কিন্তু দুর্নীতি, অনিয়ম, অশ্লীলতা তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে দেখলাম, বাবা দ্বারা মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে, শিক্ষক দ্বারা ছাত্রী ধর্ষিত হযেছে, ছাত্র দ্বারা শিক্ষক লাঞ্ছিত হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা টাকা-পয়সা ছাড়াও মাছ-মাংস উপঢৌকন হিসেবে নিচ্ছে। এগুলো কীসের আলামত?

এসব বন্ধের জন্য রাষ্ট্রের প্রচেষ্টাও কিন্তু কম নয়। ধর্মীয় অনুশাসনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যেমন দুদক, পুলিশ বিভাগ, প্রশাসন ও বিচার বিভাগসহ দুর্নীতি বন্ধে সচেষ্ট। এখানেও শর্ষেতে ভূতের খবর দেখতে পাচ্ছি। যার ফলে হতাশা বেড়েই চলছে!

একদিকে অনিয়ম বন্ধ করলে তা আবার অন্যরূপে অন্য কোনো দিকে ছড়িয়ে পড়ছে। তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণির শিশুরাও ধর্ষকের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সিভিল সার্ভিসে কর্মরত মেধাবী কর্মকর্তার মাকে দেখাশোনার জন্য অনেক সময় দেখি কেউ থাকে না। সন্তানের আয়েশী জীবনযাপন অথচ বাবার লাশ বেওয়ারিশ হয়ে আঞ্জুমানেও যায়! তাই গভীরভাবে ভাবা উচিত নীতি ও মানবিকতা বিপর্যয়ের এই ত্রুটি কোথায়!

রাষ্ট্রীয় পরিদর্শন অথরিটি ও ধর্মীয় বিধিনিষেধ কোনো কিছুই অন্যায় করা থেকে নিবৃত্ত করতে পারছে না। এর প্রধান কারণ হলো নির্লজ্জতা ও নৈতিক শিক্ষার অভাব। ফলে যত কঠিন আইনই বাস্তবায়ন করা হোক না কেন তা সাময়িক প্রবল চাপ অনুভব মাত্র! আমরা যদি একটি রাষ্ট্রকে একটি বৃক্ষের সঙ্গে তুলনা করি তাহলে তার মূল হলো শিক্ষা; কাণ্ড হলো উন্নয়ন, শাখা হলো সভ্যতা এবং পাতা হলো নৈতিকতা। এই মূলে ক্ষত দেখা দিলে ধীরে ধীরে তা ক্যান্সারের মতো ভিতরে ভিতরে মূল থেকে শিখরে ছড়িয়ে পড়বে। জীবাণুর বৃদ্ধিকাল দেখা না গেলেও তা কখনো কাণ্ডে, কখনো শাখায়, কখনো পাতায় দৃশ্যমান হয়ে উঠবে।

তবে এ শিক্ষার দায় পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রসহ সবার। আমাদের মানুষগত অবস্থানের অস্থিরতা, অবিশ্বাস ও শঙ্কার দিকে খেয়াল করলেই নির্লজ্জতা ও এর জন্য শিক্ষার ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়ে উঠে!

একজন সভ্য মানুষের প্রথম ধাপ হলো দেহের পোশাকী আবরণ। সেটা স্থান, কাল, জাতি, ধর্ম ও বর্ণভেদে ভিন্ন হতে পারে; ভিন্ন হতে পারে এর দৈর্ঘ্য ও পরিধি। কিন্তু পরিধানের প্রধান বোধ হলো লজ্জা। একটা কিছু পরিধান ছাড়া সভ্যবোধ সম্পন্ন একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে অন্য মানুষের মুখোমুখি হতে লজ্জাবোধ করবে। এ লজ্জাবোধ মানে জড়তা নয়, তা হলো মানুষবোধ।

প্রচলিত লজ্জাবোধে আমরা কাপড় দিয়ে দেহের নির্দিষ্ট কিছু অঙ্গ ঢাকা না থাকলে লজ্জা পাই, একজনের খাবার সামনে খেয়ে ফেলতে লজ্জা পাই, আপনজনদের সামনে পাগলামি করতে লজ্জা পাই! তবে পোশাকী লজ্জা হলো সবচেয়ে আদর্শগত ধারক। বিশেষ করে আমাদের সংস্কৃতিতে কোটি টাকার বিনিময়েও কেউ বস্ত্রহীন হয়ে রাস্তায় বের হবে না। কারণ এই লজ্জা একটি আদর্শিক সেন্স যা ধরে রাখতে মানুষ জীবনও দিতে পারে!

একটি বাস্তব উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমার এক বন্ধুর মায়ের রমজান মাসে সেহরি রান্না করার সময় তার পরিহিত শাড়ির আঁচলে আগুন লেগে যায়। ঘরে স্বামী সন্তান ছাড়া আর কেউ ছিল না। তিনি চাইলেই শাড়িটা খুলে ফেলে দিয়ে আগুনটা নেভাতে পারতেন! কিন্তু সন্তান যদি কোনো কারণে তাকে বস্ত্রহীন দেখে ফেলে সে লজ্জায় ইজ্জতের ভয়ে শাড়ি না খুলেই আগুন নেভাতে চেষ্টা করল এবং চিৎকার করে সবাইকে ডাকল। চিৎকার শুনে স্বামী-সন্তান ঘুম থেকে উঠে গিয়ে আগুন নেভানোর আগেই আগুন শরীরকে জ্বালিয়ে দিল। অনেক কষ্টে আগুন নিভিয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পথে বন্ধুর মা মারা গেলেন। সব মা হয়তো এমন না! কিন্তু কিছু কিছু মায়ের কাছে মৃত্যুর চেয়ে ইজ্জতই বড়। দুর্নীতি করা, হানাহানি করা, কারও ক্ষতি করা, মানবিক অধিকার হরণ করা, ধর্ষণের মতো গর্হিত কাজ করা যেমন অপরাধ, তেমনি একজন মানুষ চরিত্রের মানুষের জন্য তা লজ্জারও বিষয়। যারা এগুলো করে তারা এটাকে বাহাদুরি হিসেবে দেখে মাথা উঁচু করেই চলছে। অথচ এটা পশু চরিত্রের প্রধান লক্ষণ।

মানুষ বহুকোষী জীব। এ কোষের জীবন রহস্য এখন পর্যন্ত কোনো বিজ্ঞানী পুরোপুরি উন্মোচন করতে পারেনি। কিন্তু বিশ্বাসী আদর্শিক সেন্স দ্বারা প্রায় মানুষই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। তাই বোধের চক্ষু দিয়ে মানুষ যদি একবার টের পায় যে তার আচরণের সঙ্গে পশু চরিত্রের মিল আছে তাহলে অবশ্যই সে লজ্জা পেয়ে ভবিষ্যতে খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকবে। তাই মনে করি, লজ্জাবোধ বিকশিত না হলে মানব সম্পদ উন্নয়নের কোনো সংজ্ঞাই অর্থপূর্ণ হবে না।

এতদিনের মানবিক উন্নয়নের শত কর্মসূচি পালন সত্ত্বেও অত্যাধুনিক এ যুগে ধর্মযুদ্ধ থামছে না, এক জাতির আরেক জাতিকে শোষণ করা, কুক্ষিগত করার হীন মানসিকতা বন্ধ হচ্ছে না। নেহাত স্বার্থের জন্য আমরা প্রতিনিয়ত একে অপরকে ঠকিয়ে যাচ্ছি। একমাত্র নির্লজ্জতাই মানুষে মানুষে এ অসহনীয় পরিবেশ সৃষ্টি করে চলছে।

অন্যায়, পাপের ধরন মানুষ ও জাতি-ধর্ম বিশেষে যেমন ভিন্ন ভিন্ন; তেমনি আদর্শ ও অনুশাসনও ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু এসব অনুশাসন সমাজের জন্য কল্যাণকর হলেও মানুষ অহরহ তা অমান্য করে চলছে। মৃত্যুর পরের ফলাফলের চেয়ে জৈবিক ও বাহ্যিক ফলাফলে সবার আগ্রহ বাড়ছে। যেমন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কিছু ব্যক্তির কুকর্মের খবরে আমরা হতাশ ও মর্মাহত হচ্ছি। তাহলে এর সঠিক সমাধান কোথায়?

আসলে যত ধর্মীয় অনুশাসন আর রাষ্ট্রীয় তদারকি প্রতিষ্ঠানের আইনে বাঁধি না কেন এগুলো তো কোনো না কোনো মানুষ অবয়বের মানুষ দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে এবং হবে। কাজেই এ মানুষগুলোর যতদিন পরিবর্তন না হবে ততদিন অনৈতিক কাজ চিরতরে বন্ধ করা সম্ভব হবে না। নেদারল্যান্ডের জেলখানাতে কোন আসামি নেই। এটা তাদের মানুষের পরিবর্তনেরই বড় ফসল।

আর এ মানুষ পরিবর্তনের জন্য আমরা যত আইন-বিধি জারি করি না কেন শিক্ষা হলো তার আচরণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রকাশের প্রধান নিয়ামক। নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা দ্বারা মানুষের দেহকে পাহারা দিলেও তার রহস্যময় জিনোমিক চরিত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

আমরা হলাম শংকর জাতি। বিভিন্ন জাতি মিশ্রণের এ জিনোমিক আচরণ আরও গভীর রহস্যময়! তাকে একটা পর্যায়ে আনতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদার করার পাশাপাশি মনুষ্যত্ব ও নৈতিকতা উন্নয়নে বেশি জোর দিতে হবে। বর্তমানে আমাদের প্রচলিত শিক্ষাতে কিছুক্ষেত্রে ধর্মীয়, নৈতিক ও জাতীয়তাবোধ জাগরণের মাধ্যমে নীতিবোধ ও মূল্যবোধকে ক্ষুদ্র পরিসরে জাগানোর চেষ্টা করা হচ্ছে! আমরা বড় প্রতিষ্ঠান, বড় অফিসার, দক্ষ কারিগর গড়তে গিয়ে মানুষ গড়াকে গৌণ করে ফেলেছি। ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা হলেও নির্মূল করা যাচ্ছে না। এটা লজ্জাবোধ বিলীনের চূড়ান্ত পর্যায়।

তাই আমি মনে করি একটি সার্বজনীন লজ্জাবোধের বিকাশ ছাড়া এ থেকে উত্তোরণ সম্ভব নয়। যে ছোট শিশুর জন্ম উলঙ্গ হিসেবে তার বোধশক্তি হলে সে যখন বুঝতে পারে বস্ত্রহীন থাকা লজ্জাকর তখন সে যে কোনো মূল্যে তার ইজ্জত ঢেকে রাখে। এভাবে একজন শিশু যদি পরিবেশীয় বিভিন্ন উপাদান (পরিবার, সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি) এর শিক্ষা দ্বারা বড় হতে হতে শিখে অন্যায় করা লজ্জাকর, দুর্নীতি করা লজ্জাকর, অপকর্ম প্রকাশ পেলে সমাজে মুখ দেখানো লজ্জাকর তখন সে তা থেকে দূরে থাকবে।

ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম নৈতিক পরিবর্তন বিষয়ে বলেছেন, ‘যদি কোনো দেশ দুর্নীতিমুক্ত হয় এবং সবার মধ্যে সুন্দর মনের মানসিকতা গড়ে উঠে, আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বিশ্বাস করি সেখানকার সামাজিক জীবনে তিন রকমের মানুষ থাকবে, যারা পরিবর্তন আনতে পারেন। তারা হলেন পিতা, মাতা ও শিক্ষক।’
বোধের জাগরণ ও চর্চার মাধ্যমে একটি মানুষ চরিত্রের ভারসাম্যের সভ্যতা তৈরি করার বিকল্প নেই। কারণ উন্নয়ন, শিল্প, সভ্যতা যাই বলি না কেন অমানুষের হাতে কোনো কিছুই নিরাপদ নয়। সত্যিকারের মানুষ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব!

মোসলেম উদ্দিন : প্রভাষক, উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগ
বৃন্দাবন সরকারি কলেজ

Comments

Popular posts from this blog

বঙ্গবন্ধু, অবিনাশী তর্জনী: মুস্তফা কামরুল আখতার