এই সোহেল, ঝাঁটা ধর!! ----মনোজিৎ কুমার
রম্য গল্প
এই সোহেল, ঝাঁটা ধর!!
মনোজিৎ কুমার
---------------------------------------------------------------------------- খুলনাগামী বাসে উঠেছি। এমনিতে করোনার প্রকোপ তার উপরে সময়টা বেশ সকাল হওয়ায় বাসে যাত্রীসংখ্যা বেশ কম। কিছুদূর যাবার পর একটি নির্জন স্থানে বাস থামল। এই লাইনের বাস গুলো 'মুড়ির টিন' নাটকের বাসের মতো। যাত্রীদের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে বাসে উঠায়। তাই স্টপেজ ছাড়াও যেকোন স্থানে বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার । বাস থামার সাথে সাথেই বাসের কন্ডাক্টর নিচে নেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড পরেই তার চিৎকার শোনা গেল, "এই সোহেল, ঝাঁটা ধর।" কথাটা শুনেই পিলে চমকে গেল। ভয়ে গায়ের সমস্ত লোম খাড়া খাড়া হয়ে উঠলো। ভাবলাম তাহলে কি যাত্রীসংখ্যা অল্প পেয়ে এই নির্জন স্থানে তারা আমাদেরকে ঝাঁটা পিটা করবে? ইতিপূর্বে চলন্ত বাসে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাস থেকে যাত্রী ফেলে দিয়ে হত্যা, যাত্রীদের সাথে খারাপ ব্যবহার, মহিলা যাত্রীদের শ্লীলতাহানি , গণধর্ষণ এমনকি গণধর্ষণের পর ভুক্তভোগী যাত্রীকে বাসের জালনা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু চলন্ত বাসে যাত্রীদের ঝাঁটা পিটা করার কোন ঘটনা দেশের ইতিহাসে তো দুরের কথা বিশ্ব ইতিহাসেও শোনা যায়নি। ইতিহাসের ছাত্র ছিলাম। তাই আধুনিক যুগ, মধ্যযুগ, তাম্র যুগ, প্রস্তর যুগ , নব্য প্রস্তর যুগ ,আদিম যুগ এমনকি প্রাগৈতিহাসিক যুগের ঘটনাবলীর কথা মনে করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু না! এমন যুগান্তকারী- চাঞ্চল্যকর ঐতিহাসিক ঘটনা মনে পড়ে না । তাহলে কি দেশের ইতিহাসে এমনকি বিশ্ব ইতিহাসে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হতে যাচ্ছে ? পরেরদিন খবরের কাগজে কি এই শিরোনাম উঠবে যে-"এবার চলন্ত বাসে যাত্রীদের ঝাঁটাপেটা!" মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ডাকতে থাকলাম । ফরিয়াদ করে জানালাম-হায়রে দয়াল, না জানি কি পাপ করেছিলাম যে আজ চলন্ত বাসের ভিতর বাসের স্টাফ কর্তৃক ঝাঁটা পিটা হতে হবে। রক্ষা করো দয়াল । তুমিই তো বলেছিলে প্রভু যে মানির মান তুমিই রক্ষা করো । আমার না হয় মান-সম্মান নেই কিন্তু অন্য যাত্রীদের কি কারো মান -সম্মান নেই ? বিশেষ করে নিস্পাপ শিশুদের কী অপরাধ? ভয়টা আরও বেড়ে গেল যখন দেখলাম সামনের সারির সিটগুলোতে আমি একমাত্র পুরুষ ব্যক্তি। একেবারে প্রথম সিট ফাঁকা। আমার সামনে সিটে একজন মহিলা বসেছে। সুতরাং পুরুষ মানুষ হিসেবে আমাকে দিয়েই তাহলে কি শুরু হবে? এইরকম নানাবিধ চিন্তা করছি আর বলির পাঁঠা যেমন ঠিক বলি হবার আগ মুহূর্তে নিজের পরিণতির কথা ভাবে, তেমনি নিজের পরিণতির কথা ভাবছি । ঝাঁটার প্রথম বাড়ীটা শরীরের কোথায় লাগবে! কী পরিমান ব্যথা লাগবে! তখন আমার এক্সপ্রেশনটা কেমন হবে! চিৎকার করে কাঁদবো, নাকি হাউ মাউ করে, নাকি নীরবে চোখের জল ফেলবো ইত্যাদি ইত্যাদি। অবশেষে মিনিট তিনেক পরে দেখলাম, এক মধ্যবয়সী কাকি দুই হাতে দুটি ব্যাগ এবং বগলে একটা ঝাঁটা নিয়ে বাসে ওঠার চেষ্টা করছে। বাসের ভেতরে থাকা হেলপার সোহেল সঙ্গে সঙ্গে তার বোগল থেকে ঝাঁটাটা নিয়ে বাসের বাংকারে রাখলো। পরে জানতে পারলাম উনি জামাইয়ের বাড়ি যাচ্ছেন। জ্যৈষ্ঠ মাস তাই আম- জাম- কাঁঠাল ইত্যাদি ফল-ফলারী, খাদ্য-খাবার নিয়েছেন। সাথে বোনাস হিসেবে একটি ইনটেক মানে একেবারে আনকোরা-নতুন ঝাঁটা। যাক্ বাবা, ঝাঁটা পিটার হাত থেকে এ যাত্রায় বেঁচে গেলাম। পরে অবশ্য আফসোস হচ্ছিল- ঘটনাটি ঘটলে মন্দ হত না! মান-সম্মান গেলেও অন্তত ইতিহাসের অংশ তো হতে পারতাম। ঐতিহাসিক ঘটনার অংশ হতে আমরা কে না চাই??
মনোজিৎ কুমার,
৩৫ তম বিসিএস
প্রভাষক, (অর্থনীতি)
তালা সরকারি কলেজ, সাতক্ষীরা,
Comments
Post a Comment